Monday, March 25, 2013

লাশ গুণে নাও

লাশ গুণে নাও
. আইরিন সুলতানা

যাদের সন্দেহ হয়
তারা বধ্যভূমি খুঁড়ে হাড় গুণে নিক আজ।
যাদের সন্দেহ হয়
তারা গণকবরের শ্লীনতাহানি করে
খড়খড়ে খুলি গুণে নিক আজ।
আমার গুণতিতে ভুলচুক ঘটেছিল কিছু
সেদিন আমার চোখে অশ্রু ছিল
সেদিন আমার দৃষ্টি ছিল ঝাপসা
লাশের স্তুপ পেরিয়ে
লাশ গুণে নিতে পারিনি আমি।
গলিত লাশের বহর থেকে
লাশ গুণে নিতে পারিনি আমি।
আমার আঙ্গুল অসাড় ছিল
আমার হৃদয়ে ছিল স্বজন হারানো ক্ষত,
আমি ভারসাম্যহীন ছিলাম
আমি উম্মাদপ্রায় ছিলাম
রক্তের নদী ডিঙাতে পারিনি বলে,
তাই ভুল হলে হতে পারে আমারো
পঁচা লাশের গুণতিতে…!
তোমরা গুণে নাও একে একে
অস্থি-মজ্জাসহ
রক্ত কণিকাসহ
ছিন্ন ভিন্ন উদর
বেয়নেটে বিক্ষত পাঁজর
সব জুড়ে জুড়ে ৩০ লক্ষ
জ্বলজ্যান্ত লাশ গুণে নাও


sources: http://bangla.bdnews24.com/arts/article606306.bdnews 

Sunday, March 10, 2013

Please donate to help the minority communities in Bangladesh

Photo: Daily Star

Minority communities in Bangladesh have been the victims of violent attacks in Bangladesh by extremists since February 28, 2013. More than 1,000 homes and nearly 100 places of worship were attacked over the past few days. Many died, succumbing to their injuries, and homes, temples and institutions have been burned down. Your support for these communities is very necessary now.


http://www.amnesty.org/en/for-media/press-releases/bangladesh-wave-violent-attacks-against-hindu-minority-2013-03-06
http://www.thedailystar.net/newDesign/news-details.php?nid=270925
http://www.thedailystar.net/beta2/news/jamaat-continues-attacking-hindus/
http://bdnews24.com/bangladesh/2013/03/02/minorities-resent-jamaat-attacks
http://www.nytimes.com/2013/03/01/opinion/bangladesh-40-year-quest-for-justice.html?_r=0
http://www.nytimes.com/2013/03/01/opinion/bangladeshs-40-year-quest-for-justice.html?_r=1&

Please donate to help the minority communities in Bangladesh who have been the victims of recent violent attacks. Any amount is helpful. US Bangladesh Advisory Council is partnering with BLAST (Bangladesh Legal Aid and Services Trust), a leading legal services organization which has offices in 19 districts (www.blast.org.bd/). Please donate by March 10 so that USBAC, BLAST and local volunteers can get help to the affected communities promptly. You can use your PayPal account to donate. If you don’t have a PayPal account you can still use your credit card on the Paypal site mentioned bellow:
http://usbac.org/Donate.html
http://www.usbac.org
http://www.facebook.com/USBAC
http://twitter.com/USBangladesh

Tuesday, January 17, 2012

আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও সিলেটের পরিবেশ

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান

জানুয়ারী ১৬, ২০১২
আমাদের চতুষ্পার্শ্বস্থ অবস্থান হচ্ছে আমাদের পরিবেশ। মৃত্তিকা, জলবায়ু, গাছপালা এবং জন্তু-জানোয়ার যেসবের সমাহারে আমাদের পৃথিবীটা গড়ে উঠেছে, তাদের সামগ্রিক অবস্থানকেও সাধারণভাবে আমরা পরিবেশ বলে থাকি। সদর্থে শুধু আমাদের বাইরের অবস্থান নয়, আমাদের স্বীয় অবস্থানও পরিবেশের অন্তর্ভুক্ত। পরিবেশদূষণ বলতে আমরা অনেক সময় আমাদের বাসস্থানের বাইরে জল বা বায়ুর দূষণ বোঝালেও শব্দটি আমাদের ঘরের অভ্যন্তরের এবং ঘরের বাইরের দূষণকেও বোঝায়। প্রকৃতি ও পরিবেশ মানুষের চেয়েও বেশী অনুভূতিপ্রবণ ও স্পর্শকাতর। পরিবেশের রাগ-অভিমানের সঙ্গে মানিয়ে চলতে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসনে নানা ট্যাবু বা বিধি নিষেধের জন্ম হয়েছে। সেই পরিবেশের মক্ষীরানী উদ্ভিদ। সেই উদ্ভিদকে আমরা পোষ মানাই ও আদর যত্ন করি আর তার প্রতিদানে আমরা অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয় ও ঔষধ পেয়ে থাকি। আমাদের পরিবারের একজন ভেবে তার যত্নাদি ও দেখভাল করতে হবে। শিশু, যুবক ও বৃদ্ধের মতো তা কখনও মেজাজি, দেমাকি বা অনুকম্পাপ্রার্থী ।
ইংরেজিতে অ্যাবঅরিজিন, অ্যাবঅরিজিন্যালস ও ইন্ডিজেনাস শব্দগুলো নিয়ে নানা বাহাস। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার বছর ধরে সেদেশে বাস করছে আদিবাসীদের পরম উদাহরণ তারাই। একসময় অ্যাবঅরিজিনস বলতে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদেরই বোঝাত।
‘ইন্ডিজেনাস’ পদটি বহু বছর ধরে একটা সাধারণ পদ হিসেবে চলে আসছে। কোনো কোনো দেশে ভিন্ন শব্দের প্রতি আকর্ষণ রয়েছে। যেমন, জনজাতি, প্রথম জাতি, আদিবাসী, পাহাড়ি, যাযাবর ইত্যাদি। জাতিসংঘের মতে, আদিবাসীদের সংজ্ঞায়িত করার চেয়ে শনাক্তিকরণই হবে অধিকতর ফলপ্রদ দৃষ্টিভঙ্গি। মানবাধিকারের বিভিন্ন দলিলের ওপর ভিত্তিই হবে সেই স্ব-শনাক্তিকরণের নির্ণায়ক।
আদিবাসীরা যদি নিজেদেরকে আদিবাসী বলে শনাক্ত করতে চান এবং তাতে তাদের মর্যাদা বা আত্মপ্রত্যয় বৃদ্ধি পায় এবং তাঁরা কিছু সুযোগ-সুবিধা লাভ করেন, তবে আমাদের কী বলার আছে? আদিবাসী বনাম উপজাতির মামলায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। আদিবাসীদের মধ্যকার বৈচিত্র্য ও বিশিষ্টতা লক্ষ করে জাতিসংঘ ‘ইন্ডিজেনাস’ শব্দটির কোনো সংজ্ঞা দেওয়া সমীচীন মনে করেনি। বরং সামান্য কয়েকটি রূপরেখায় শব্দটির একটা ইঙ্গিতময় তাৎপর্য দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। আদিবাসীরা ব্যক্তিপর্যায়ে নিজেদেরকে আদিবাসী হিসেবে শনাক্ত করলে সমাজ তাদেরকে সেইভাবে গ্রহণ করবে। উপনিবেশ-পূর্ব ও বসতি-পূর্ব অবস্থার সঙ্গে এক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় আদিবাসী অঞ্চল-অধ্যুষিত চতুষ্পার্শ্ব প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে একটা দৃঢ় যোগসূত্র রয়েছে। নির্দিষ্ট সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ধারায় এবং তার নির্দিষ্ট ভাষা, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে সম্প্রদায় হিসেবে আদিবাসীরা তাঁদের পূর্বপুরুষ হতে প্রাপ্ত পরিবেশ ও পদ্ধতির সংরক্ষণ ও নবায়নের ক্ষেত্রে সচেষ্ট।
১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে প্রথম বিশ্ব পরিবেশ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। গত ত্রিশ বছরের পরিবেশ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ১১০০ জন বিজ্ঞানী একটি প্রতিবেদন পেশ করে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনটি ২২ মে ২০০২ লন্ডনে প্রকাশিত পৃথিবীর সমগ্র জনগণকে হুঁশিয়ার করে যে, আগামী ত্রিশ বছরের মধ্যে পৃথিবীর প্রাকৃতিক জগতের ৭০ ভাগ দূষিত, বহু প্রাণীপ্রজাতি বিলুপ্ত এবং বহু দেশের মানবসমাজের অধঃপতন ঘটবে।
বিংশ শতাব্দীতে যেসব দেশ মানবাধিকার ও মানব সভ্যতার কথা বলতে আজ সোচ্চার, সেই সব দেশের অভিযাত্রিক, ভাগ্যান্বেষী, সৈনিক, ব্যবসায়ী ও ধর্মপ্রচারক পৃথিবীর সব ক’টি মহাদেশের আদিবাসীদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার চালিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমেরিন্ডিয়ান আদিবাসীদের সঙ্গে ৪০০টি চুক্তি করে এবং প্রতিটি চুক্তি ভঙ্গ করে। ঐতিহাসিক হাওয়ার্ড জিন আমাদের এই তথ্যটি দিয়েছেন। মনে হতে পারে, চুক্তি করে ভঙ্গ করার চেয়ে চুক্তি না করাই ভালো। তবে চুক্তি হলে উভয় পক্ষের আরও সংলাপের জন্য একটা প্রস্তুতি থাকে এবং তা অসম্পূর্ণ হলেও একটা বোঝাপড়ার সহায়ক আবহাওয়ার সৃষ্টি করতে পারে।
আদিবাসীদের হিতার্থে বিভিন্ন দেশে যেসব পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে তার মধ্যে একটি সংরক্ষিত এলাকায় বিশেষ জনগোষ্ঠীকে সীমাবদ্ধ রাখার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এই সংরক্ষণের লক্ষণরেখা ভেদ করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আদান-প্রদান বাঁধাপ্রাপ্ত হয়। আদিবাসীদের সম্পর্কে ছক বেঁধে বিধান দেওয়ার তেমন অবকাশ নেই। বিভিন্ন আদিবাসীদের সমস্যা বিভিন্ন রকম। যেখানে একটি বিশেষ আদিবাসী সংখ্যায় অতি অল্প এবং বিপন্নভাবে জীবন যাপন করছে, যেখানে একটি সীমিত জায়গায় তারা যদি স্বেচ্ছায় একত্র হয়ে বাস করতে চায়, তবে সে ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে।
১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তরের এক প্রকাশনায় বলা হয়, ‘দেশে পরিবেশদূষণের জন্য ১ হাজার ১৭৬টি শিল্পকারখানা দায়ী।’ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘উত্তরাঞ্চলে ৪১ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।’ ১৪ জুন, ২০০০ জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান উদ্বোধনের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশে ১৭ প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে, আরো ৩০০ বিলুপ্তির পথে।’
পরিবেশদূষণ প্রতিহত করার জন্য শতাধিক আন্তর্জাতিক চুক্তি রয়েছে। এসব চুক্তি বলবৎ করার ব্যাপারে শিল্পোন্নত দেশগুলোর কেউ কেউ আপত্তি জানাচ্ছে। পরিবেশ রক্ষাকল্পে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সম্পর্কে আমাদের দেশে দু’শরও বেশি আইন আছে। ১৯৭৩ সালে পানিদূষণ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি করা হয়। তারপর ১৯৯৫ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন প্রণীত হয়। ১৯৯৯ সালে বায়োসেফটি গাইড-লাইন্স অব বাংলাদেশ প্রণয়ন করা হয়।
আদিবাসীদের সম্পর্কে একটা বিতর্ক প্রায়শ উত্থাপিত হয়, যার উত্তর দেওয়া সহজ নয়। আদিবাসীদের নোবল স্যাভেজ বা সম্ভ্রান্ত বন্য হিসেবে কল্পনা করে নানা কল্পকথা এবং তার ওপর ভিত্তি করে নানা তত্ত্বকথা রচিত হয়েছে। দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের আত্তীকরণ কি হবে, না সম্পূর্ণভাবে স্বতন্ত্র থাকবে? আমেরিন্ডিয়ানদের কোনো কোনো গোষ্ঠী সংরক্ষিত এলাকায় বাস করে এবং কিছু বিশেষ সুবিধা ভোগ করে থাকে। আমাদের দেশে এমন ব্যবস্থার কোনো প্রয়োজন হয়নি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আদিবাসী সমাজ যে ভূখণ্ড তাদের বাসস্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে, তা নানা চলাচলের পরিক্রমায় গড়ে উঠেছে। আদিবাসীরা পর্যটকদের কৌতূহলের বিষয় হিসেবে বসবাস করবে না। আধুনিক যুগের উৎপাদনব্যবস্থা, সম্পত্তির অধিকার ইত্যাদির ব্যাপারে তাদের একেবারে বিচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব নয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি আত্তীকরণ বা সামাজিকভাবে একীকরণের পক্ষে নই এবং পরকীকরণেরও পক্ষে নই। আমি মনে করি আদিবাসীরা তারা তাদের মত থাকবে। তবে যেকোনো সামাজিক উন্নয়ন পরিবর্তনে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মতকে প্রাধান্য দিতে হবে। এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সমীচীন হবে না, যার ফলে ভিন্ন তরঙ্গের আঘাতে কোনো আদিবাসী সমাজের প্লাবিত বা নিমজ্জিত হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। যুগে যুগে বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর মধ্যে যাতায়াত হয়েছে। সেই চলাচল থেমে থাকেনি।
১৯৭২ সালে আমাদের সংবিধান প্রবর্তিত হয়। তার পরে স্বদেশী, আদিবাসী স্বার্থ সংরক্ষণে কিছু নতুন আন্তর্জাতিক কনভেনশন হয়েছে। আমাদের দেশে প্রায় ৫৫টি বৃহৎ আদিবাসী সম্প্রদায়সহ মোট ৭৫টির মত আদিবাসী সম্প্রদায় রয়েছে। আইনের চোখে সকলের সমান আশ্রয় নিশ্চিত করে এবং অনগ্রসর জনজাতির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভবপর করা যায় বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে। সংবিধানের দাক্ষিণ্য সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সদিচ্ছা সকল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের থাকলে দুর্লঙ্ঘ্য কোনো বাধা থাকার কথা নয়। প্রবল ও অগ্রসর সম্প্রদায়ের সঙ্গে অনগ্রসর ব্যক্তিদের পক্ষে আইনি লড়াই করা বড়ই কঠিন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত টুলালিপ আমেরিন্ডিয়ান গোষ্ঠীর নেত্রীস্থানীয় জেনেট ম্যাকক্লাউড সেই আইনের লড়াই চালাতে গিয়ে দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আমি সূর্যের নিচে একটা জায়গা পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করছি, কিন্তু আমার গায়ে আমি কেবল গুচ্ছের ফোসকা উঠতে দেখছি।’
আদিবাসীদের যেকোনো সমস্যায় তাদের মতামত গ্রহণ করা বিধেয় ও একান্ত জরুরি। প্রশাসন যে সকল আদিবাসীদের ভালো করতে চায় তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে হবে। তাদের মতামতকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব না দিলে মঙ্গলাকাঙ্খীর অনুকম্পা-প্রবণতা বুমেরাং হয়ে ফিরে এসে প্রশাসনকে আঘাত করবে। প্রশাসনের ধৈর্যচ্যুতি ঘটলে অতিষ্ঠ হয়ে প্রশাসন বিপথে চালিত হতে পারে।
আদিবাসীদের স্বকীয় জীবনধারা যাতে অব্যাহত থাকে সেদিকে লক্ষ্য করে তাদের মধ্যে শিক্ষার বিকিরণ ঘটাতে হবে। অনগ্রসরতা দূরীকরণের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে শিক্ষা। অর্থবল ও বাহুবলের চেয়ে ভাগ্যোন্নয়নে শিক্ষার মূল্য যে সর্বাধিক তা যেকোনো সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে চলমানতা লক্ষ করলে আমরা বুঝতে পারব।
আমরা ইকোপার্ক করব পরিবেশ ও মানুষের সার্বিক মঙ্গলার্থে। সেখানে যদি পর্যটকরা বেড়াতে আসে আমরা তাদের অভ্যর্থনা জানাব। কিন্তু সে ইকোপার্কের ফলে আদিবাসীদের গায়ে যেন ফোসাকা না ওঠে এবং তাদের হাহাকার যেন প্রতিধ্বনি না জাগায়।
বাংলাদেশের অবাঙালি আদিবাসীরা বাঙালিদের চেয়ে তুলনামূলকভাবে অধিকতর পরিচ্ছন্ন জীবন যাপন করেন। আদিবাসীদের মধ্যে যে সততা, স্বভাব-সারল্য, বিশ্বস্ততা, পরিচ্ছন্নতাবোধ, আতিথেয়তা আমরা দেখতে পাই তার থেকে আমাদের শেখার রয়েছে। নারী ও বৃদ্ধ পিতা-মাতা ও সুবিধা বঞ্চিত আত্মীয়স্বজনকে আদিবাসীরা যে চোখে দেখে তার থেকেও আমাদের শেখার রয়েছে।
আদিবাসীদের আর্ট, নৃত্য-গীত ও শিল্পকলা ছাড়াও সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে ও নিজস্ব চিকিৎসা ব্যবস্থায় রোগনিরাময়ে আদিবাসীরা যুগ যুগ ধরে যে ব্যবস্থার বিধান দিয়ে আসছে সে সম্পর্কে আরো গবেষণা করলে আমরা সকলেই উপকৃত হব।
আমি আগে বলেছি, আজ আবার বলছি ‘স্বদেশ স্বদেশ করিস রে ভাই এদেশ তোদের স্বদেশ নয়’–এমন মন খাঁ-খাঁ করা খেদ যেন আদিবাসীদের মনে না জাগে, সেদিকে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সজাগ থাকতে হবে।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
(১৪ জানুয়ারী ২০১২, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘‘আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও সিলেটের পরিবেশ’’ শীর্ষক কনভেনশনে প্রধান অতিথির বক্তব্য)

Sunday, January 15, 2012

আদিবাসীদের সংজ্ঞায়ন নয় শনাক্তকরণই বেশি জরুরি

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেছেন, আদিবাসীদের সংজ্ঞায়ন গুরুত্বপূর্ণ নয়, শনাক্তকরণই বেশি জরুরি। পৃথিবীর সব দেশেই আদিবাসীদের প্রতি অবিচার করা হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে অনেক শেখার আছে। তাদের সততা, স্বভাব-সারল্য, পরিচ্ছন্নতা অন্যতম। আদিবাসীদের চিত্রকলা, নৃত্যগীত ও নিজস্ব ওষুধ উদ্ভাবন ও প্রয়োগ-পদ্ধতি থেকেও শেখার রয়েছে।
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও সিলেটের পরিবেশ’ শীর্ষক তিন দিনের সম্মেলনের (কনভেনশন) সমাপনী অধিবেশনে গতকাল শনিবার প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আদিবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় ১৪ দফা অভিন্ন দাবির সঙ্গে সংগতি রেখে ছয়টি দাবির ‘সিলেট ঘোষণা’ দিয়ে রাতে সম্মেলন শেষ হয়।
গতকাল সমাপনী উপলক্ষে দিনব্যাপী আটটি ‘টেকনিক্যাল সেশন’ হয়। সিলেট অঞ্চলের পরিবেশ ও আদিবাসী নিয়ে বিভিন্ন অধিবেশনে পরিবেশ ও আদিবাসীবিষয়ক ২০টি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। বিভিন্ন অধিবেশনে সিলেটের সাংসদ ইমরান আহমদ, মৌলভীবাজারের সাংসদ সৈয়দ মুহসীন আলী, সাংসদ নবাব আলী আব্বাস, সিলেটের সাবেক সাংসদ নাজিম কামরান চৌধুরী, সাবেক সাংসদ কলিমউদ্দিন আহমদসহ আমন্ত্রিত পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, আদিবাসী ও পরিবেশবাদী নেতারা তাঁদের মতামত পেশ করেন।
ওই অধিবেশনে বিশেষ অতিথি ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান ও রাজা দেবাশীষ রায়। সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশনে প্রধান পৃষ্ঠপোষক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. সালেহ উদ্দিন ও আয়োজকদের পক্ষে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন বক্তব্য দেন। সম্মেলনের আহ্বায়ক শরিফ জামিল ও সদস্যসচিব মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বাগত বক্তব্য দেন।
আকবর আলি খান বলেন, ‘আধুনিক সভ্যতা গড়তে গিয়ে আদিবাসীদের জীবনের প্রতি যে অবিচার করা হয়েছে, এ জন্য বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব দেশের ক্ষমা চাওয়া উচিত।’
রাজা দেবাশীষ রায় বলেন, দেশে এমন কিছু এলাকা রয়েছে, যেখানে আদিবাসীরাই স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের রক্ষক। তারা যে শুধু দেশে থেকে আক্রমণের শিকার হচ্ছে তা-ই নয়, বহিরাক্রমণেরও শিকার হচ্ছে।
সুলতানা কামাল বলেন, ‘আদিবাসীরা আজ নিজভূমে পরবাসী। আদিবাসীদের অধিকার শুধু তাদের অধিকারের বিষয় নয়, এটা আমাদের সবার অস্তিত্বের ব্যাপার।’
‘সিলেট ঘোষণা’য় ছয় দাবি
রাত সাতটায় সর্বশেষ অধিবেশনে আদিবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় ছয়টি দাবির ‘সিলেট ঘোষণা’ প্রকাশ করা হয়। সিলেট ঘোষণার দাবিগুলো হচ্ছে: বন ও পাহাড়ের অবক্ষয় বন্ধ করা, জাফলং-জৈন্তার পিয়াইন ও ডাউকি নদী থেকে পাথর উত্তোলনের নামে আদিবাসীদের উচ্ছেদ-তৎপরতা বন্ধ করা, মৌলভীবাজারের খেজুরছড়াসহ খাসিয়া পানপুঞ্জিতে গাছ কাটা বন্ধ করে নাহার চা-বাগান মালিকদের বেআইনিভাবে ৪০০ একর বনভূমি আদিবাসীদের ফিরিয়ে দেওয়া, আদিবাসী শ্রমিকদের চা-বাগানের জমি বন্দোবস্ত বাবদ ভাড়া বা কর প্রদান বন্ধ করা, সিলেটের চা-বাগানগুলোতে শ্রমিকদের বসতভিটার মালিকানা প্রদানের মাধ্যমে অভিবাসনের স্থায়ী স্বীকৃতি দেওয়া এবং চা-বাগানের শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে বৈষম্য দূর করা।
ছয় দাবি আদায়ে বাপা, বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন), পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠনকে একাত্ম করে দেশব্যাপী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রয়াস চালানোর কথা সিলেট ঘোষণার সাংগঠনিক প্রস্তাব হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সভাপতিত্বে সিলেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন নারী মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবি। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন লেখক-কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ। আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং ও বেনের দীপেন ভট্টাচার্য বক্তব্য দেন। For more > http://www.prothom-alo.com/detail/news/216703

আদিবাসীদের সংজ্ঞায়ন নয় শনাক্তকরণই বেশি জরুরি

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেছেন, আদিবাসীদের সংজ্ঞায়ন গুরুত্বপূর্ণ নয়, শনাক্তকরণই বেশি জরুরি। পৃথিবীর সব দেশেই আদিবাসীদের প্রতি অবিচার করা হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে অনেক শেখার আছে। তাদের সততা, স্বভাব-সারল্য, পরিচ্ছন্নতা অন্যতম। আদিবাসীদের চিত্রকলা, নৃত্যগীত ও নিজস্ব ওষুধ উদ্ভাবন ও প্রয়োগ-পদ্ধতি থেকেও শেখার রয়েছে। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও সিলেটের পরিবেশ’ শীর্ষক তিন দিনের সম্মেলনের (কনভেনশন) সমাপনী অধিবেশনে গতকাল শনিবার প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আদিবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় ১৪ দফা অভিন্ন দাবির সঙ্গে সংগতি রেখে ছয়টি দাবির ‘সিলেট ঘোষণা’ দিয়ে রাতে সম্মেলন শেষ হয়।গতকাল সমাপনী উপলক্ষে দিনব্যাপী আটটি ‘টেকনিক্যাল সেশন’ হয়। সিলেট অঞ্চলের পরিবেশ ও আদিবাসী নিয়ে বিভিন্ন অধিবেশনে পরিবেশ ও আদিবাসীবিষয়ক ২০টি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। বিভিন্ন অধিবেশনে সিলেটের সাংসদ ইমরান আহমদ, মৌলভীবাজারের সাংসদ সৈয়দ মুহসীন আলী, সাংসদ নবাব আলী আব্বাস, সিলেটের সাবেক সাংসদ নাজিম কামরান চৌধুরী, সাবেক সাংসদ কলিমউদ্দিন আহমদসহ আমন্ত্রিত পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, আদিবাসী ও পরিবেশবাদী নেতারা তাঁদের মতামত পেশ করেন। ওই অধিবেশনে বিশেষ অতিথি ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান ও রাজা দেবাশীষ রায়। সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশনে প্রধান পৃষ্ঠপোষক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. সালেহ উদ্দিন ও আয়োজকদের পক্ষে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন বক্তব্য দেন। সম্মেলনের আহ্বায়ক শরিফ জামিল ও সদস্যসচিব মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বাগত বক্তব্য দেন। আকবর আলি খান বলেন, ‘আধুনিক সভ্যতা গড়তে গিয়ে আদিবাসীদের জীবনের প্রতি যে অবিচার করা হয়েছে, এ জন্য বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব দেশের ক্ষমা চাওয়া উচিত।’ রাজা দেবাশীষ রায় বলেন, দেশে এমন কিছু এলাকা রয়েছে, যেখানে আদিবাসীরাই স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের রক্ষক। তারা যে শুধু দেশে থেকে আক্রমণের শিকার হচ্ছে তা-ই নয়, বহিরাক্রমণেরও শিকার হচ্ছে। সুলতানা কামাল বলেন, ‘আদিবাসীরা আজ নিজভূমে পরবাসী। আদিবাসীদের অধিকার শুধু তাদের অধিকারের বিষয় নয়, এটা আমাদের সবার অস্তিত্বের ব্যাপার।’ ‘সিলেট ঘোষণা’য় ছয় দাবিরাত সাতটায় সর্বশেষ অধিবেশনে আদিবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় ছয়টি দাবির ‘সিলেট ঘোষণা’ প্রকাশ করা হয়। সিলেট ঘোষণার দাবিগুলো হচ্ছে: বন ও পাহাড়ের অবক্ষয় বন্ধ করা, জাফলং-জৈন্তার পিয়াইন ও ডাউকি নদী থেকে পাথর উত্তোলনের নামে আদিবাসীদের উচ্ছেদ-তৎপরতা বন্ধ করা, মৌলভীবাজারের খেজুরছড়াসহ খাসিয়া পানপুঞ্জিতে গাছ কাটা বন্ধ করে নাহার চা-বাগান মালিকদের বেআইনিভাবে ৪০০ একর বনভূমি আদিবাসীদের ফিরিয়ে দেওয়া, আদিবাসী শ্রমিকদের চা-বাগানের জমি বন্দোবস্ত বাবদ ভাড়া বা কর প্রদান বন্ধ করা, সিলেটের চা-বাগানগুলোতে শ্রমিকদের বসতভিটার মালিকানা প্রদানের মাধ্যমে অভিবাসনের স্থায়ী স্বীকৃতি দেওয়া এবং চা-বাগানের শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে বৈষম্য দূর করা।ছয় দাবি আদায়ে বাপা, বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন), পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠনকে একাত্ম করে দেশব্যাপী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রয়াস চালানোর কথা সিলেট ঘোষণার সাংগঠনিক প্রস্তাব হিসেবে উল্লেখ করা হয়।বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সভাপতিত্বে সিলেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন নারী মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবি। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন লেখক-কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ। আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং ও বেনের দীপেন ভট্টাচার্য বক্তব্য দেন। For more go http://www.prothom-alo.com/detail/mid/57/date/2012-01-15/news/216703

Thursday, January 12, 2012

পাহাড়ের টুকরো কথা-০৯

পূর্বকথা
সেই ব্রিটিশ আমল থেকে আমরা অন্যের জমিতে প্রতিদিন বাধ্যতামূলকভাবে মজুরি (শ্রম) দিয়ে আসছি। কেউ মজুরি দিতে না পারলে তার বদলে গ্রামের অন্য কোনো নারী-পুরুষকে মজুরি দিতে হয়। নইলে জরিমানা বা শাস্তির ভয় আছে। তবে সবচেয়ে বেশি ভয় যেকোনো সময় জমি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের ঢালে প্রায় ১০ হাজার ত্রিপুরা জনজাতির শ্রম দাসত্বের চিত্রটি এভাবেই ফুটিয়ে তুললেন ছোট কুমিরা নামক আদিবাসী পল্লীর নিকুঞ্জ ত্রিপুরা (৭০)।
কিছুদিন আগে পেশাগত কারণে সেখানের ছোট কুমিরা, বড় কুমিরা, সুলতানী মন্দির, মহাদেবপুরসহ বিভিন্ন ত্রিপুরা আদিবাসী পল্লী ঘুরে দেখা যায় ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানবেতর জীবন। ভূমিহীন, হত-দরিদ্র ত্রিপুরারা সেখানে অন্যের জমিতে বসবাস করেন। জীবিকার জন্য বংশপরম্পরায় তাঁদের বাধ্যতামূলকভাবে ব্যক্তিমালিকানার জমি ও ফলবাগানে শ্রম দিতে হয়। বিনিময়ে তাঁরা পান মাথাপিছু দৈনিক ১৪০ টাকা। কোনো কারণে এই শ্রম দিতে ব্যর্থ হলে তাঁদের দিতে হয় বদলি শ্রম অথবা জরিমানা।
এতো কিছুর পরও ফসলের জমি ও ফলবাগানের সম্পদ ভোগ করার কোনো অধিকার তাদের নেই। সেখানে নেই শিক্ষা, চিকিৎসা, স্যানিটেশন, সুপেয় জল বা বিদ্যুৎ সুবিধা। উপরন্তু ঝুপড়ি কুঁড়ে ঘরগুলোতে বসবাসের জন্য একেকটি গ্রাম থেকে তাদের জমির মালিককে বছরে পাঁচ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়।
বন বিভাগের সংরক্ষিত পাহাড়-বনাঞ্চল ও ব্যক্তিমালিকানাধীন টিলায় অনুমতি না থাকায় তারা হারিয়ে ফেলেছেন জুম চাষ ও শিকারের ঐতিহ্য। এতোকিছুর পরেও বাড়তি দুর্ভোগ হিসেবে রয়েছে প্রতি মুহূর্তে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক।

স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা আলাপকালে জানালেন, ত্রিপুরাদের এই দুরবস্থা সম্পর্কে তারাও ওয়াকিবহাল। কিন্তু সীতাকুণ্ডের জায়গা-জমি 'অকৃষিভুক্ত' বলে চিহ্নিত হওয়ায় সেখানের খাসজমিতে তাদের পুনর্বাসনে আইনগত সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, তবে সরকারের নীতিনির্ধারক মহল সিদ্ধান্ত নিলে বিশেষ বিবেচনায় নীতিমালা শিথিল করে ত্রিপুরাদের খাসজমিতে পুনর্বাসন করা সম্ভব। এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় বলে মনে করেন তারা।

ছোট কুমিরা ত্রিপুরা পল্লীর কর্ণরাম ত্রিপুরা (৪০) এই লেখককে জানান, ব্রিটিশ তারা পাহাড় ও জঙ্গল পরিষ্কার করে গ্রামটি প্রতিষ্ঠা করেন। এখন সেখানে ৯০টি পরিবারের বসবাস। আশপাশের টিলাসহ গ্রামটি অনেক বছর ধরে জহুর আহমেদ চৌধুরী নামে এক ব্যক্তির ইজারাধীন। খুব ভোরে গ্রামের নারী-পুরুষরা 'মালিকের' রাবার বাগানে শ্রম দিতে যান। সেখানে বাগান পরিষ্কার করার পাশাপাশি জঙ্গল থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করার কাজও করেন তারা। এই করে কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে তাদের দিন কাটছে।
কয়েক বছর আগে 'ইপসা' নামের একটি বেসরকারি সংস্থা সেখানে উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। বেশকিছু আদিবাসী ছেলেমেয়ে সেখানে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে, এমন একজনকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি পুরো গ্রামে।
ইপসা ছাড়া অন্য কোনো সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এখনো কোনো রকম নাগরিক সুবিধাই গ্রামটিতে পৌঁছে দেয়নি। পানীয়জলের জন্য এখনো গ্রামবাসী পাতকুয়া ও ছড়ার ওপর নির্ভরশীল। স্যানিটেশন ব্যবস্থাও নেই। সন্ধ্যা ঘনালে কেরোসিনের কুপি বাতির টিমটিমে আলোই ভরসা।
অন্যদিকে, মহাদেবপুর ত্রিপুরা পল্লীতে কোনো স্কুলও নেই। সেখানে বসবাসকারী ৪৫টি আদিবাসী পরিবার ভিন্ন ধরনের শোষণের শিকার। ওই পল্লীর পঞ্চকুমার ত্রিপুরা (৬৫) এই লেখককে জানান, প্রায় ৩৫ বছর আগে জঙ্গল পরিষ্কার করে তারা গ্রামটি প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানকার ইজারাদার ইস্কান্দর চৌধুরীর সঙ্গে মৌখিক চুক্তিতে গ্রামবাসী আশপাশের টিলায় বিশাল কাঁঠাল বাগান ও পেয়ারা বাগান তৈরি করেন।
তখন কথা ছিলো, আদিবাসীরা প্রতিবছর এসব ফলের আধাআধি ভাগ পাবেন। কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই চুক্তির কথা অস্বীকার করেন ইজারাদার। তখন থেকেই ফলদ সম্পদের ওপর অধিকার হারিয়ে গ্রামবাসী নিজেদের তৈরি ফলবাগানে বাধ্যতামূলক শ্রম দিয়ে আসছেন। ইজারাদারের মৃত্যুর পর তার ছেলেরা বাগান ও গ্রামের ইজারাদার হয়েছেন। কিন্তু আদিবাসীদের ভাগ্য ফেরেনি।
ওই গ্রামের বাসিন্দা মনিবালা ত্রিপুরা (৫০) বললেন:
মালিক আমাদের জমি থেকে উঠে যেতে বললে যে কোনো সময় উচ্ছেদ হতে হবে। তখন আমরা যাব কোথায়? ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে খাব কী? এখানে তবু কোনো রকমে বেঁচে তো আছি!..
ত্রিপুরা গ্রামগুলো ঘুরে দেখার পুরো সময় সাংবাদিক-মানবাধিকার কর্মীর ছোট্ট দলটিকে ঘিরে রাখে এক ঝাঁক হতদরিদ্র আদিবাসী শিশু। অধিকাংশই বাংলা ভাষা বোঝে না, শহুরে 'বাঙাল'দের কাজকর্ম দেখাতেই তাদের যতো আগ্রহ।কাজের ফাঁকে মোবাইল ফোনের ক্যামেরাতে তোলা হয় বেশকিছু আলোকচিত্র।
সব দুঃখগাঁথা ছাপিয়ে ছবি তুলতে শিশুরাই দেখায় ব্যপক উৎসাহ।
চন্দ্র বিজয় বা নয়া গ্যালাক্সি আবিস্কার বা ক্লোনের পর ল্যাবরেটরীতে প্রাণ সৃষ্টির মহা মহা কীর্তি গাঁথার যুগেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে অল্প কয়েক কিলোমিটার দূরে ঐতিহাসিক চন্দ্রনাথের পাহাড়ের কোলের ত্রিপুরাদের এই দূরাবস্থার কথা জেনে পথপ্রদর্শক সহযাত্রী ত্রিপুরা ছাত্রছাত্রীদের মুখে বাক্য সরে না।
খাগড়াছড়ির বাসিন্দা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী পিপিকা ত্রিপুরা ফেরার পথে বললেন:
এখানের আদিবাসীরা এখনো যেনো সেই সামন্তযুগেই আটকে আছে! দু-মুঠো আহার যোগাড় করতেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম জীবনপাত করছে। কেউ তাদের পাশে নেই!
---
সংযুক্ত: এ যুগেও ১০ হাজার ত্রিপুরা আদিবাসী শ্রমদাস, দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২৪ জুলাই ২০১০।

পাহাড়ের টুকরো কথা-০৯

পূর্বকথা
সেই ব্রিটিশ আমল থেকে আমরা অন্যের জমিতে প্রতিদিন বাধ্যতামূলকভাবে মজুরি (শ্রম) দিয়ে আসছি। কেউ মজুরি দিতে না পারলে তার বদলে গ্রামের অন্য কোনো নারী-পুরুষকে মজুরি দিতে হয়। নইলে জরিমানা বা শাস্তির ভয় আছে। তবে সবচেয়ে বেশি ভয় যেকোনো সময় জমি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের ঢালে প্রায় ১০ হাজার ত্রিপুরা জনজাতির শ্রম দাসত্বের চিত্রটি এভাবেই ফুটিয়ে তুললেন ছোট কুমিরা নামক আদিবাসী পল্লীর নিকুঞ্জ ত্রিপুরা (৭০)।
কিছুদিন আগে পেশাগত কারণে সেখানের ছোট কুমিরা, বড় কুমিরা, সুলতানী মন্দির, মহাদেবপুরসহ বিভিন্ন ত্রিপুরা আদিবাসী পল্লী ঘুরে দেখা যায় ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানবেতর জীবন। ভূমিহীন, হত-দরিদ্র ত্রিপুরারা সেখানে অন্যের জমিতে বসবাস করেন। জীবিকার জন্য বংশপরম্পরায় তাঁদের বাধ্যতামূলকভাবে ব্যক্তিমালিকানার জমি ও ফলবাগানে শ্রম দিতে হয়। বিনিময়ে তাঁরা পান মাথাপিছু দৈনিক ১৪০ টাকা। কোনো কারণে এই শ্রম দিতে ব্যর্থ হলে তাঁদের দিতে হয় বদলি শ্রম অথবা জরিমানা।
এতো কিছুর পরও ফসলের জমি ও ফলবাগানের সম্পদ ভোগ করার কোনো অধিকার তাদের নেই। সেখানে নেই শিক্ষা, চিকিৎসা, স্যানিটেশন, সুপেয় জল বা বিদ্যুৎ সুবিধা। উপরন্তু ঝুপড়ি কুঁড়ে ঘরগুলোতে বসবাসের জন্য একেকটি গ্রাম থেকে তাদের জমির মালিককে বছরে পাঁচ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়।
বন বিভাগের সংরক্ষিত পাহাড়-বনাঞ্চল ও ব্যক্তিমালিকানাধীন টিলায় অনুমতি না থাকায় তারা হারিয়ে ফেলেছেন জুম চাষ ও শিকারের ঐতিহ্য। এতোকিছুর পরেও বাড়তি দুর্ভোগ হিসেবে রয়েছে প্রতি মুহূর্তে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক।

স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা আলাপকালে জানালেন, ত্রিপুরাদের এই দুরবস্থা সম্পর্কে তারাও ওয়াকিবহাল। কিন্তু সীতাকুণ্ডের জায়গা-জমি 'অকৃষিভুক্ত' বলে চিহ্নিত হওয়ায় সেখানের খাসজমিতে তাদের পুনর্বাসনে আইনগত সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, তবে সরকারের নীতিনির্ধারক মহল সিদ্ধান্ত নিলে বিশেষ বিবেচনায় নীতিমালা শিথিল করে ত্রিপুরাদের খাসজমিতে পুনর্বাসন করা সম্ভব। এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় বলে মনে করেন তারা।

ছোট কুমিরা ত্রিপুরা পল্লীর কর্ণরাম ত্রিপুরা (৪০) এই লেখককে জানান, ব্রিটিশ তারা পাহাড় ও জঙ্গল পরিষ্কার করে গ্রামটি প্রতিষ্ঠা করেন। এখন সেখানে ৯০টি পরিবারের বসবাস। আশপাশের টিলাসহ গ্রামটি অনেক বছর ধরে জহুর আহমেদ চৌধুরী নামে এক ব্যক্তির ইজারাধীন। খুব ভোরে গ্রামের নারী-পুরুষরা 'মালিকের' রাবার বাগানে শ্রম দিতে যান। সেখানে বাগান পরিষ্কার করার পাশাপাশি জঙ্গল থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করার কাজও করেন তারা। এই করে কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে তাদের দিন কাটছে।
কয়েক বছর আগে 'ইপসা' নামের একটি বেসরকারি সংস্থা সেখানে উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। বেশকিছু আদিবাসী ছেলেমেয়ে সেখানে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে, এমন একজনকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি পুরো গ্রামে।
ইপসা ছাড়া অন্য কোনো সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এখনো কোনো রকম নাগরিক সুবিধাই গ্রামটিতে পৌঁছে দেয়নি। পানীয়জলের জন্য এখনো গ্রামবাসী পাতকুয়া ও ছড়ার ওপর নির্ভরশীল। স্যানিটেশন ব্যবস্থাও নেই। সন্ধ্যা ঘনালে কেরোসিনের কুপি বাতির টিমটিমে আলোই ভরসা।
অন্যদিকে, মহাদেবপুর ত্রিপুরা পল্লীতে কোনো স্কুলও নেই। সেখানে বসবাসকারী ৪৫টি আদিবাসী পরিবার ভিন্ন ধরনের শোষণের শিকার। ওই পল্লীর পঞ্চকুমার ত্রিপুরা (৬৫) এই লেখককে জানান, প্রায় ৩৫ বছর আগে জঙ্গল পরিষ্কার করে তারা গ্রামটি প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানকার ইজারাদার ইস্কান্দর চৌধুরীর সঙ্গে মৌখিক চুক্তিতে গ্রামবাসী আশপাশের টিলায় বিশাল কাঁঠাল বাগান ও পেয়ারা বাগান তৈরি করেন।
তখন কথা ছিলো, আদিবাসীরা প্রতিবছর এসব ফলের আধাআধি ভাগ পাবেন। কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই চুক্তির কথা অস্বীকার করেন ইজারাদার। তখন থেকেই ফলদ সম্পদের ওপর অধিকার হারিয়ে গ্রামবাসী নিজেদের তৈরি ফলবাগানে বাধ্যতামূলক শ্রম দিয়ে আসছেন। ইজারাদারের মৃত্যুর পর তার ছেলেরা বাগান ও গ্রামের ইজারাদার হয়েছেন। কিন্তু আদিবাসীদের ভাগ্য ফেরেনি।
ওই গ্রামের বাসিন্দা মনিবালা ত্রিপুরা (৫০) বললেন:
মালিক আমাদের জমি থেকে উঠে যেতে বললে যে কোনো সময় উচ্ছেদ হতে হবে। তখন আমরা যাব কোথায়? ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে খাব কী? এখানে তবু কোনো রকমে বেঁচে তো আছি!..
ত্রিপুরা গ্রামগুলো ঘুরে দেখার পুরো সময় সাংবাদিক-মানবাধিকার কর্মীর ছোট্ট দলটিকে ঘিরে রাখে এক ঝাঁক হতদরিদ্র আদিবাসী শিশু। অধিকাংশই বাংলা ভাষা বোঝে না, শহুরে 'বাঙাল'দের কাজকর্ম দেখাতেই তাদের যতো আগ্রহ।কাজের ফাঁকে মোবাইল ফোনের ক্যামেরাতে তোলা হয় বেশকিছু আলোকচিত্র।
সব দুঃখগাঁথা ছাপিয়ে ছবি তুলতে শিশুরাই দেখায় ব্যপক উৎসাহ।
চন্দ্র বিজয় বা নয়া গ্যালাক্সি আবিস্কার বা ক্লোনের পর ল্যাবরেটরীতে প্রাণ সৃষ্টির মহা মহা কীর্তি গাঁথার যুগেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে অল্প কয়েক কিলোমিটার দূরে ঐতিহাসিক চন্দ্রনাথের পাহাড়ের কোলের ত্রিপুরাদের এই দূরাবস্থার কথা জেনে পথপ্রদর্শক সহযাত্রী ত্রিপুরা ছাত্রছাত্রীদের মুখে বাক্য সরে না।
খাগড়াছড়ির বাসিন্দা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী পিপিকা ত্রিপুরা ফেরার পথে বললেন:
এখানের আদিবাসীরা এখনো যেনো সেই সামন্তযুগেই আটকে আছে! দু-মুঠো আহার যোগাড় করতেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম জীবনপাত করছে। কেউ তাদের পাশে নেই!
---
সংযুক্ত: এ যুগেও ১০ হাজার ত্রিপুরা আদিবাসী শ্রমদাস, দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২৪ জুলাই ২০১০।

আদিবাসী, ভূমি ও জীবন

আদিবাসীদের কাছে ভূমিই জীবন, ভূমিই অস্তিত্ব। আদিবাসীদের ভূমি অধিকার কিছু বলার আগে, সম্পদ, ভূমি, বন, প্রাণী জগত, ধরিত্রী ও অধিকার সম্পর্কে আদ...