Thursday, January 12, 2012

পাহাড়ের টুকরো কথা-০৯

পূর্বকথা
সেই ব্রিটিশ আমল থেকে আমরা অন্যের জমিতে প্রতিদিন বাধ্যতামূলকভাবে মজুরি (শ্রম) দিয়ে আসছি। কেউ মজুরি দিতে না পারলে তার বদলে গ্রামের অন্য কোনো নারী-পুরুষকে মজুরি দিতে হয়। নইলে জরিমানা বা শাস্তির ভয় আছে। তবে সবচেয়ে বেশি ভয় যেকোনো সময় জমি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের ঢালে প্রায় ১০ হাজার ত্রিপুরা জনজাতির শ্রম দাসত্বের চিত্রটি এভাবেই ফুটিয়ে তুললেন ছোট কুমিরা নামক আদিবাসী পল্লীর নিকুঞ্জ ত্রিপুরা (৭০)।
কিছুদিন আগে পেশাগত কারণে সেখানের ছোট কুমিরা, বড় কুমিরা, সুলতানী মন্দির, মহাদেবপুরসহ বিভিন্ন ত্রিপুরা আদিবাসী পল্লী ঘুরে দেখা যায় ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানবেতর জীবন। ভূমিহীন, হত-দরিদ্র ত্রিপুরারা সেখানে অন্যের জমিতে বসবাস করেন। জীবিকার জন্য বংশপরম্পরায় তাঁদের বাধ্যতামূলকভাবে ব্যক্তিমালিকানার জমি ও ফলবাগানে শ্রম দিতে হয়। বিনিময়ে তাঁরা পান মাথাপিছু দৈনিক ১৪০ টাকা। কোনো কারণে এই শ্রম দিতে ব্যর্থ হলে তাঁদের দিতে হয় বদলি শ্রম অথবা জরিমানা।
এতো কিছুর পরও ফসলের জমি ও ফলবাগানের সম্পদ ভোগ করার কোনো অধিকার তাদের নেই। সেখানে নেই শিক্ষা, চিকিৎসা, স্যানিটেশন, সুপেয় জল বা বিদ্যুৎ সুবিধা। উপরন্তু ঝুপড়ি কুঁড়ে ঘরগুলোতে বসবাসের জন্য একেকটি গ্রাম থেকে তাদের জমির মালিককে বছরে পাঁচ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়।
বন বিভাগের সংরক্ষিত পাহাড়-বনাঞ্চল ও ব্যক্তিমালিকানাধীন টিলায় অনুমতি না থাকায় তারা হারিয়ে ফেলেছেন জুম চাষ ও শিকারের ঐতিহ্য। এতোকিছুর পরেও বাড়তি দুর্ভোগ হিসেবে রয়েছে প্রতি মুহূর্তে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক।

স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা আলাপকালে জানালেন, ত্রিপুরাদের এই দুরবস্থা সম্পর্কে তারাও ওয়াকিবহাল। কিন্তু সীতাকুণ্ডের জায়গা-জমি 'অকৃষিভুক্ত' বলে চিহ্নিত হওয়ায় সেখানের খাসজমিতে তাদের পুনর্বাসনে আইনগত সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, তবে সরকারের নীতিনির্ধারক মহল সিদ্ধান্ত নিলে বিশেষ বিবেচনায় নীতিমালা শিথিল করে ত্রিপুরাদের খাসজমিতে পুনর্বাসন করা সম্ভব। এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় বলে মনে করেন তারা।

ছোট কুমিরা ত্রিপুরা পল্লীর কর্ণরাম ত্রিপুরা (৪০) এই লেখককে জানান, ব্রিটিশ তারা পাহাড় ও জঙ্গল পরিষ্কার করে গ্রামটি প্রতিষ্ঠা করেন। এখন সেখানে ৯০টি পরিবারের বসবাস। আশপাশের টিলাসহ গ্রামটি অনেক বছর ধরে জহুর আহমেদ চৌধুরী নামে এক ব্যক্তির ইজারাধীন। খুব ভোরে গ্রামের নারী-পুরুষরা 'মালিকের' রাবার বাগানে শ্রম দিতে যান। সেখানে বাগান পরিষ্কার করার পাশাপাশি জঙ্গল থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করার কাজও করেন তারা। এই করে কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে তাদের দিন কাটছে।
কয়েক বছর আগে 'ইপসা' নামের একটি বেসরকারি সংস্থা সেখানে উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। বেশকিছু আদিবাসী ছেলেমেয়ে সেখানে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে, এমন একজনকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি পুরো গ্রামে।
ইপসা ছাড়া অন্য কোনো সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এখনো কোনো রকম নাগরিক সুবিধাই গ্রামটিতে পৌঁছে দেয়নি। পানীয়জলের জন্য এখনো গ্রামবাসী পাতকুয়া ও ছড়ার ওপর নির্ভরশীল। স্যানিটেশন ব্যবস্থাও নেই। সন্ধ্যা ঘনালে কেরোসিনের কুপি বাতির টিমটিমে আলোই ভরসা।
অন্যদিকে, মহাদেবপুর ত্রিপুরা পল্লীতে কোনো স্কুলও নেই। সেখানে বসবাসকারী ৪৫টি আদিবাসী পরিবার ভিন্ন ধরনের শোষণের শিকার। ওই পল্লীর পঞ্চকুমার ত্রিপুরা (৬৫) এই লেখককে জানান, প্রায় ৩৫ বছর আগে জঙ্গল পরিষ্কার করে তারা গ্রামটি প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানকার ইজারাদার ইস্কান্দর চৌধুরীর সঙ্গে মৌখিক চুক্তিতে গ্রামবাসী আশপাশের টিলায় বিশাল কাঁঠাল বাগান ও পেয়ারা বাগান তৈরি করেন।
তখন কথা ছিলো, আদিবাসীরা প্রতিবছর এসব ফলের আধাআধি ভাগ পাবেন। কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই চুক্তির কথা অস্বীকার করেন ইজারাদার। তখন থেকেই ফলদ সম্পদের ওপর অধিকার হারিয়ে গ্রামবাসী নিজেদের তৈরি ফলবাগানে বাধ্যতামূলক শ্রম দিয়ে আসছেন। ইজারাদারের মৃত্যুর পর তার ছেলেরা বাগান ও গ্রামের ইজারাদার হয়েছেন। কিন্তু আদিবাসীদের ভাগ্য ফেরেনি।
ওই গ্রামের বাসিন্দা মনিবালা ত্রিপুরা (৫০) বললেন:
মালিক আমাদের জমি থেকে উঠে যেতে বললে যে কোনো সময় উচ্ছেদ হতে হবে। তখন আমরা যাব কোথায়? ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে খাব কী? এখানে তবু কোনো রকমে বেঁচে তো আছি!..
ত্রিপুরা গ্রামগুলো ঘুরে দেখার পুরো সময় সাংবাদিক-মানবাধিকার কর্মীর ছোট্ট দলটিকে ঘিরে রাখে এক ঝাঁক হতদরিদ্র আদিবাসী শিশু। অধিকাংশই বাংলা ভাষা বোঝে না, শহুরে 'বাঙাল'দের কাজকর্ম দেখাতেই তাদের যতো আগ্রহ।কাজের ফাঁকে মোবাইল ফোনের ক্যামেরাতে তোলা হয় বেশকিছু আলোকচিত্র।
সব দুঃখগাঁথা ছাপিয়ে ছবি তুলতে শিশুরাই দেখায় ব্যপক উৎসাহ।
চন্দ্র বিজয় বা নয়া গ্যালাক্সি আবিস্কার বা ক্লোনের পর ল্যাবরেটরীতে প্রাণ সৃষ্টির মহা মহা কীর্তি গাঁথার যুগেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে অল্প কয়েক কিলোমিটার দূরে ঐতিহাসিক চন্দ্রনাথের পাহাড়ের কোলের ত্রিপুরাদের এই দূরাবস্থার কথা জেনে পথপ্রদর্শক সহযাত্রী ত্রিপুরা ছাত্রছাত্রীদের মুখে বাক্য সরে না।
খাগড়াছড়ির বাসিন্দা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী পিপিকা ত্রিপুরা ফেরার পথে বললেন:
এখানের আদিবাসীরা এখনো যেনো সেই সামন্তযুগেই আটকে আছে! দু-মুঠো আহার যোগাড় করতেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম জীবনপাত করছে। কেউ তাদের পাশে নেই!
---
সংযুক্ত: এ যুগেও ১০ হাজার ত্রিপুরা আদিবাসী শ্রমদাস, দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২৪ জুলাই ২০১০।

পাহাড়ের টুকরো কথা-০৯

পূর্বকথা
সেই ব্রিটিশ আমল থেকে আমরা অন্যের জমিতে প্রতিদিন বাধ্যতামূলকভাবে মজুরি (শ্রম) দিয়ে আসছি। কেউ মজুরি দিতে না পারলে তার বদলে গ্রামের অন্য কোনো নারী-পুরুষকে মজুরি দিতে হয়। নইলে জরিমানা বা শাস্তির ভয় আছে। তবে সবচেয়ে বেশি ভয় যেকোনো সময় জমি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের ঢালে প্রায় ১০ হাজার ত্রিপুরা জনজাতির শ্রম দাসত্বের চিত্রটি এভাবেই ফুটিয়ে তুললেন ছোট কুমিরা নামক আদিবাসী পল্লীর নিকুঞ্জ ত্রিপুরা (৭০)।
কিছুদিন আগে পেশাগত কারণে সেখানের ছোট কুমিরা, বড় কুমিরা, সুলতানী মন্দির, মহাদেবপুরসহ বিভিন্ন ত্রিপুরা আদিবাসী পল্লী ঘুরে দেখা যায় ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানবেতর জীবন। ভূমিহীন, হত-দরিদ্র ত্রিপুরারা সেখানে অন্যের জমিতে বসবাস করেন। জীবিকার জন্য বংশপরম্পরায় তাঁদের বাধ্যতামূলকভাবে ব্যক্তিমালিকানার জমি ও ফলবাগানে শ্রম দিতে হয়। বিনিময়ে তাঁরা পান মাথাপিছু দৈনিক ১৪০ টাকা। কোনো কারণে এই শ্রম দিতে ব্যর্থ হলে তাঁদের দিতে হয় বদলি শ্রম অথবা জরিমানা।
এতো কিছুর পরও ফসলের জমি ও ফলবাগানের সম্পদ ভোগ করার কোনো অধিকার তাদের নেই। সেখানে নেই শিক্ষা, চিকিৎসা, স্যানিটেশন, সুপেয় জল বা বিদ্যুৎ সুবিধা। উপরন্তু ঝুপড়ি কুঁড়ে ঘরগুলোতে বসবাসের জন্য একেকটি গ্রাম থেকে তাদের জমির মালিককে বছরে পাঁচ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়।
বন বিভাগের সংরক্ষিত পাহাড়-বনাঞ্চল ও ব্যক্তিমালিকানাধীন টিলায় অনুমতি না থাকায় তারা হারিয়ে ফেলেছেন জুম চাষ ও শিকারের ঐতিহ্য। এতোকিছুর পরেও বাড়তি দুর্ভোগ হিসেবে রয়েছে প্রতি মুহূর্তে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক।

স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা আলাপকালে জানালেন, ত্রিপুরাদের এই দুরবস্থা সম্পর্কে তারাও ওয়াকিবহাল। কিন্তু সীতাকুণ্ডের জায়গা-জমি 'অকৃষিভুক্ত' বলে চিহ্নিত হওয়ায় সেখানের খাসজমিতে তাদের পুনর্বাসনে আইনগত সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, তবে সরকারের নীতিনির্ধারক মহল সিদ্ধান্ত নিলে বিশেষ বিবেচনায় নীতিমালা শিথিল করে ত্রিপুরাদের খাসজমিতে পুনর্বাসন করা সম্ভব। এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় বলে মনে করেন তারা।

ছোট কুমিরা ত্রিপুরা পল্লীর কর্ণরাম ত্রিপুরা (৪০) এই লেখককে জানান, ব্রিটিশ তারা পাহাড় ও জঙ্গল পরিষ্কার করে গ্রামটি প্রতিষ্ঠা করেন। এখন সেখানে ৯০টি পরিবারের বসবাস। আশপাশের টিলাসহ গ্রামটি অনেক বছর ধরে জহুর আহমেদ চৌধুরী নামে এক ব্যক্তির ইজারাধীন। খুব ভোরে গ্রামের নারী-পুরুষরা 'মালিকের' রাবার বাগানে শ্রম দিতে যান। সেখানে বাগান পরিষ্কার করার পাশাপাশি জঙ্গল থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করার কাজও করেন তারা। এই করে কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে তাদের দিন কাটছে।
কয়েক বছর আগে 'ইপসা' নামের একটি বেসরকারি সংস্থা সেখানে উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। বেশকিছু আদিবাসী ছেলেমেয়ে সেখানে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে, এমন একজনকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি পুরো গ্রামে।
ইপসা ছাড়া অন্য কোনো সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এখনো কোনো রকম নাগরিক সুবিধাই গ্রামটিতে পৌঁছে দেয়নি। পানীয়জলের জন্য এখনো গ্রামবাসী পাতকুয়া ও ছড়ার ওপর নির্ভরশীল। স্যানিটেশন ব্যবস্থাও নেই। সন্ধ্যা ঘনালে কেরোসিনের কুপি বাতির টিমটিমে আলোই ভরসা।
অন্যদিকে, মহাদেবপুর ত্রিপুরা পল্লীতে কোনো স্কুলও নেই। সেখানে বসবাসকারী ৪৫টি আদিবাসী পরিবার ভিন্ন ধরনের শোষণের শিকার। ওই পল্লীর পঞ্চকুমার ত্রিপুরা (৬৫) এই লেখককে জানান, প্রায় ৩৫ বছর আগে জঙ্গল পরিষ্কার করে তারা গ্রামটি প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানকার ইজারাদার ইস্কান্দর চৌধুরীর সঙ্গে মৌখিক চুক্তিতে গ্রামবাসী আশপাশের টিলায় বিশাল কাঁঠাল বাগান ও পেয়ারা বাগান তৈরি করেন।
তখন কথা ছিলো, আদিবাসীরা প্রতিবছর এসব ফলের আধাআধি ভাগ পাবেন। কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই চুক্তির কথা অস্বীকার করেন ইজারাদার। তখন থেকেই ফলদ সম্পদের ওপর অধিকার হারিয়ে গ্রামবাসী নিজেদের তৈরি ফলবাগানে বাধ্যতামূলক শ্রম দিয়ে আসছেন। ইজারাদারের মৃত্যুর পর তার ছেলেরা বাগান ও গ্রামের ইজারাদার হয়েছেন। কিন্তু আদিবাসীদের ভাগ্য ফেরেনি।
ওই গ্রামের বাসিন্দা মনিবালা ত্রিপুরা (৫০) বললেন:
মালিক আমাদের জমি থেকে উঠে যেতে বললে যে কোনো সময় উচ্ছেদ হতে হবে। তখন আমরা যাব কোথায়? ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে খাব কী? এখানে তবু কোনো রকমে বেঁচে তো আছি!..
ত্রিপুরা গ্রামগুলো ঘুরে দেখার পুরো সময় সাংবাদিক-মানবাধিকার কর্মীর ছোট্ট দলটিকে ঘিরে রাখে এক ঝাঁক হতদরিদ্র আদিবাসী শিশু। অধিকাংশই বাংলা ভাষা বোঝে না, শহুরে 'বাঙাল'দের কাজকর্ম দেখাতেই তাদের যতো আগ্রহ।কাজের ফাঁকে মোবাইল ফোনের ক্যামেরাতে তোলা হয় বেশকিছু আলোকচিত্র।
সব দুঃখগাঁথা ছাপিয়ে ছবি তুলতে শিশুরাই দেখায় ব্যপক উৎসাহ।
চন্দ্র বিজয় বা নয়া গ্যালাক্সি আবিস্কার বা ক্লোনের পর ল্যাবরেটরীতে প্রাণ সৃষ্টির মহা মহা কীর্তি গাঁথার যুগেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে অল্প কয়েক কিলোমিটার দূরে ঐতিহাসিক চন্দ্রনাথের পাহাড়ের কোলের ত্রিপুরাদের এই দূরাবস্থার কথা জেনে পথপ্রদর্শক সহযাত্রী ত্রিপুরা ছাত্রছাত্রীদের মুখে বাক্য সরে না।
খাগড়াছড়ির বাসিন্দা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী পিপিকা ত্রিপুরা ফেরার পথে বললেন:
এখানের আদিবাসীরা এখনো যেনো সেই সামন্তযুগেই আটকে আছে! দু-মুঠো আহার যোগাড় করতেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম জীবনপাত করছে। কেউ তাদের পাশে নেই!
---
সংযুক্ত: এ যুগেও ১০ হাজার ত্রিপুরা আদিবাসী শ্রমদাস, দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২৪ জুলাই ২০১০।

পাহাড়ের টুকরো কথা-০৯

পূর্বকথা
সেই ব্রিটিশ আমল থেকে আমরা অন্যের জমিতে প্রতিদিন বাধ্যতামূলকভাবে মজুরি (শ্রম) দিয়ে আসছি। কেউ মজুরি দিতে না পারলে তার বদলে গ্রামের অন্য কোনো নারী-পুরুষকে মজুরি দিতে হয়। নইলে জরিমানা বা শাস্তির ভয় আছে। তবে সবচেয়ে বেশি ভয় যেকোনো সময় জমি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের ঢালে প্রায় ১০ হাজার ত্রিপুরা জনজাতির শ্রম দাসত্বের চিত্রটি এভাবেই ফুটিয়ে তুললেন ছোট কুমিরা নামক আদিবাসী পল্লীর নিকুঞ্জ ত্রিপুরা (৭০)।
কিছুদিন আগে পেশাগত কারণে সেখানের ছোট কুমিরা, বড় কুমিরা, সুলতানী মন্দির, মহাদেবপুরসহ বিভিন্ন ত্রিপুরা আদিবাসী পল্লী ঘুরে দেখা যায় ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানবেতর জীবন। ভূমিহীন, হত-দরিদ্র ত্রিপুরারা সেখানে অন্যের জমিতে বসবাস করেন। জীবিকার জন্য বংশপরম্পরায় তাঁদের বাধ্যতামূলকভাবে ব্যক্তিমালিকানার জমি ও ফলবাগানে শ্রম দিতে হয়। বিনিময়ে তাঁরা পান মাথাপিছু দৈনিক ১৪০ টাকা। কোনো কারণে এই শ্রম দিতে ব্যর্থ হলে তাঁদের দিতে হয় বদলি শ্রম অথবা জরিমানা।
এতো কিছুর পরও ফসলের জমি ও ফলবাগানের সম্পদ ভোগ করার কোনো অধিকার তাদের নেই। সেখানে নেই শিক্ষা, চিকিৎসা, স্যানিটেশন, সুপেয় জল বা বিদ্যুৎ সুবিধা। উপরন্তু ঝুপড়ি কুঁড়ে ঘরগুলোতে বসবাসের জন্য একেকটি গ্রাম থেকে তাদের জমির মালিককে বছরে পাঁচ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়।
বন বিভাগের সংরক্ষিত পাহাড়-বনাঞ্চল ও ব্যক্তিমালিকানাধীন টিলায় অনুমতি না থাকায় তারা হারিয়ে ফেলেছেন জুম চাষ ও শিকারের ঐতিহ্য। এতোকিছুর পরেও বাড়তি দুর্ভোগ হিসেবে রয়েছে প্রতি মুহূর্তে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক।

স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা আলাপকালে জানালেন, ত্রিপুরাদের এই দুরবস্থা সম্পর্কে তারাও ওয়াকিবহাল। কিন্তু সীতাকুণ্ডের জায়গা-জমি 'অকৃষিভুক্ত' বলে চিহ্নিত হওয়ায় সেখানের খাসজমিতে তাদের পুনর্বাসনে আইনগত সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, তবে সরকারের নীতিনির্ধারক মহল সিদ্ধান্ত নিলে বিশেষ বিবেচনায় নীতিমালা শিথিল করে ত্রিপুরাদের খাসজমিতে পুনর্বাসন করা সম্ভব। এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় বলে মনে করেন তারা।

ছোট কুমিরা ত্রিপুরা পল্লীর কর্ণরাম ত্রিপুরা (৪০) এই লেখককে জানান, ব্রিটিশ তারা পাহাড় ও জঙ্গল পরিষ্কার করে গ্রামটি প্রতিষ্ঠা করেন। এখন সেখানে ৯০টি পরিবারের বসবাস। আশপাশের টিলাসহ গ্রামটি অনেক বছর ধরে জহুর আহমেদ চৌধুরী নামে এক ব্যক্তির ইজারাধীন। খুব ভোরে গ্রামের নারী-পুরুষরা 'মালিকের' রাবার বাগানে শ্রম দিতে যান। সেখানে বাগান পরিষ্কার করার পাশাপাশি জঙ্গল থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করার কাজও করেন তারা। এই করে কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে তাদের দিন কাটছে।
কয়েক বছর আগে 'ইপসা' নামের একটি বেসরকারি সংস্থা সেখানে উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। বেশকিছু আদিবাসী ছেলেমেয়ে সেখানে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে, এমন একজনকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি পুরো গ্রামে।
ইপসা ছাড়া অন্য কোনো সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এখনো কোনো রকম নাগরিক সুবিধাই গ্রামটিতে পৌঁছে দেয়নি। পানীয়জলের জন্য এখনো গ্রামবাসী পাতকুয়া ও ছড়ার ওপর নির্ভরশীল। স্যানিটেশন ব্যবস্থাও নেই। সন্ধ্যা ঘনালে কেরোসিনের কুপি বাতির টিমটিমে আলোই ভরসা।
অন্যদিকে, মহাদেবপুর ত্রিপুরা পল্লীতে কোনো স্কুলও নেই। সেখানে বসবাসকারী ৪৫টি আদিবাসী পরিবার ভিন্ন ধরনের শোষণের শিকার। ওই পল্লীর পঞ্চকুমার ত্রিপুরা (৬৫) এই লেখককে জানান, প্রায় ৩৫ বছর আগে জঙ্গল পরিষ্কার করে তারা গ্রামটি প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানকার ইজারাদার ইস্কান্দর চৌধুরীর সঙ্গে মৌখিক চুক্তিতে গ্রামবাসী আশপাশের টিলায় বিশাল কাঁঠাল বাগান ও পেয়ারা বাগান তৈরি করেন।
তখন কথা ছিলো, আদিবাসীরা প্রতিবছর এসব ফলের আধাআধি ভাগ পাবেন। কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই চুক্তির কথা অস্বীকার করেন ইজারাদার। তখন থেকেই ফলদ সম্পদের ওপর অধিকার হারিয়ে গ্রামবাসী নিজেদের তৈরি ফলবাগানে বাধ্যতামূলক শ্রম দিয়ে আসছেন। ইজারাদারের মৃত্যুর পর তার ছেলেরা বাগান ও গ্রামের ইজারাদার হয়েছেন। কিন্তু আদিবাসীদের ভাগ্য ফেরেনি।
ওই গ্রামের বাসিন্দা মনিবালা ত্রিপুরা (৫০) বললেন:
মালিক আমাদের জমি থেকে উঠে যেতে বললে যে কোনো সময় উচ্ছেদ হতে হবে। তখন আমরা যাব কোথায়? ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে খাব কী? এখানে তবু কোনো রকমে বেঁচে তো আছি!..
ত্রিপুরা গ্রামগুলো ঘুরে দেখার পুরো সময় সাংবাদিক-মানবাধিকার কর্মীর ছোট্ট দলটিকে ঘিরে রাখে এক ঝাঁক হতদরিদ্র আদিবাসী শিশু। অধিকাংশই বাংলা ভাষা বোঝে না, শহুরে 'বাঙাল'দের কাজকর্ম দেখাতেই তাদের যতো আগ্রহ।কাজের ফাঁকে মোবাইল ফোনের ক্যামেরাতে তোলা হয় বেশকিছু আলোকচিত্র।
সব দুঃখগাঁথা ছাপিয়ে ছবি তুলতে শিশুরাই দেখায় ব্যপক উৎসাহ।
চন্দ্র বিজয় বা নয়া গ্যালাক্সি আবিস্কার বা ক্লোনের পর ল্যাবরেটরীতে প্রাণ সৃষ্টির মহা মহা কীর্তি গাঁথার যুগেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে অল্প কয়েক কিলোমিটার দূরে ঐতিহাসিক চন্দ্রনাথের পাহাড়ের কোলের ত্রিপুরাদের এই দূরাবস্থার কথা জেনে পথপ্রদর্শক সহযাত্রী ত্রিপুরা ছাত্রছাত্রীদের মুখে বাক্য সরে না।
খাগড়াছড়ির বাসিন্দা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী পিপিকা ত্রিপুরা ফেরার পথে বললেন:
"এখানের আদিবাসীরা এখনো যেনো সেই সামন্তযুগেই আটকে আছে! দু-মুঠো আহার যোগাড় করতেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম জীবনপাত করছে। কেউ তাদের পাশে নেই!"
---
সংযুক্ত: এ যুগেও ১০ হাজার ত্রিপুরা আদিবাসী শ্রমদাস, দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২৪ জুলাই ২০১০।

পাহাড়ের টুকরো কথা-০৮ | উন্মোচন

পাহাড়ের টুকরো কথা-০৮
লিখেছেন: বিপ্লব রহমান • প্রকাশকাল: 21 নভেম্বর 2011 - 7:39অপরাহ্ন
পূর্বকথা
বান্দরবানের দূর্গম পাহাড়ে ডিসেম্বরের ভোরে হীম বাতাসের কামড় ও ধোঁয়াশার দাপট খানিকটা কমে এলে সহযাত্রী সাংবাদিক বুদ্ধজ্যোতি চাকমাসহ পরিকল্পনা করা হবে আরো দূর যাত্রার। সে দফায় বর্ষিয়ান বম গ্রাম প্রধান সাংলিয়ান কারবারী গাইড করবেন মেঘপুঞ্জিঁ ভেদ করে খাড়া উঠে যাওয়া ক্রেওক্রাডং পর্বত-লঙ্খন পর্বে। এর আগেই সাংবাদিক কাম অভিযাত্রীদ্বয় কাটিয়ে উঠবেন বগা লেকের অপার বিস্ময়

যাত্রার প্রাক-প্রস্তুতি পর্ব হিসেবে সঙ্গে থাকবে হালকা ঝোলা ব্যাগ। ব্যাগের ভেতর জলের বোতল, টর্চ (হঠাৎ রাত্রিবাসের প্রয়োজনে), প্যারাসিটামল ট্যাবলেট, ওরস্যালাইন, ডেটল-ব্যাণ্ডেজ, কয়েক প্যাকেট বিস্কুট, এক ছড়া পাহাড়ি কলা, সিগারেট-ম্যাচ ইত্যাদি।

এরআগে দুজনায় কারবারীদার কিশোরি কন্যা ময় মহাজনের আপ্যায়নে শাপলা লতা-সিঁদোলের ঝোল তরকারি ও খানিকটা গরম ভাতে সেরে ফেলা হবে সকালের প্রাতঃরাশ। খাবারের ফাঁকে 'ময়' কথাটির অর্থ জানতে চাওয়ায় লাজুক কিশোরির চতুর উত্তর হবে এ রকম:

যখন আপনারা ক্রেওক্রাডং-এর চূড়ায় পৌঁছাবেন, তখনই জানতে পারবেন এই নামের অর্থ!

ক্রেওক্রাডং-এর খাড়া পাহাড় ভেঙে পায়ে চলা শুরু পথ ধরে বিচিত্র পথযাত্রায় মুগ্ধ হতে হবে চারপাশের সুনশান প্রাকৃতিক নিরবতায়। চারপাশে পাহাড়ের পরে পাহাড়, মেঘের পরে মেঘ, অরণ্যর পরে অরণ্য, সবুজের পর আরো সবুজ...যেন ন্যাশনাল জিওগ্রাফি টেলিভিশন বা ডিসকভারি চ্যানেলের 'ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড'।

মাঝে মাঝে যাত্রা বিরতির ফাঁকে সাংলিয়ান দা' বলবেন পাহাড়ের ভয়াবহ 'ইঁদুর বন্যা'র কথা। বাঁশের পাকা বীজ খেয়ে বেড়ে যায় পাহাড়ি ধেড়ে ইঁদুরের প্রজনন ক্ষমতা, দ্রুত বংশ বিস্তার ঘটে বাহিনীর। এরপর বন্যার পানির মতো ধেয়ে আসা ইঁদুরের ঝাঁক পাহাড় জুড়ে আক্রমণ চালায় জুম ফসলের ক্ষেতে। নিমেষে ইঁদুর-উদর পূর্তিতে শুন্য হয় সাজানো বাগান। পাহাড় জুড়ে দেখা দেয় নিরব দুর্ভিক্ষ, হাহাকার। ...চাকমা ভাষায় এরই নাম 'ইঁদুর বন্যা', বম ভাষায় 'মাওথাম'।

পথের দুপাশের বনে বিমোহিত করে রাখা বুনো ফুলের ঝাঁক; চমক ভেঙে ফেলবে নির্ঘাত হঠাৎ দেখা ও কুশল বিনিময় একদল জুম চাষীর কথায়। তারা সকলেই সাংলিয়ান কারবারী দা'র আত্নীয়-স্বজন। নিকট পাহাড়ের জুম চাষী এইসব নারী-পুরুষ সর্বসান্ত হয়ে এখন দল বেঁধে পাড়ি জমিয়েছেন রুমা বাজারের উদ্দেশ্য-- যদি দিন-মজুরির কোনো একটা কাজ জুটে যায়!

চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে বুদ্ধ বা এই লেখক-- কারো মুখে আর বাক্য সরে না। ...
বিশাল বড় বড় বোল্ডারে ঘেরা জল কলকল উচ্ছল এক পাহাড়ি ঝর্ণার পাশে বসে বিস্কুট-কলা খেয়ে জলের বোতল ভরে নেওয়া হবে সত্যিকারের মিনারেল ওয়াটারে। এরপর অভিযাত্রী দ্বয় ধূমপানের ফাঁকে কারবারী দা'র কাছে শুনবেন এক আশ্চর্য গেরিলা নেতার নাম -- লাল ডেঙ্গা।

ক্রেওক্রাডং-এর কখনো সাবেক গেরিলা দল শান্তিবাহিনী ছিল না, এ কথা জানিয়ে স্মৃতি হাতড়ে সাংলিয়ান দা’ বলেন:
আমাদের এখানে শান্তিবাহিনী কখনো স্থায়ীভাবে ছিলো না। তবে এখানে তাদের যাতায়ত ছিলো।"

আমাদের এখানে অনেক বছর ছিলো মিজো বাহিনী। কেওক্রাডং এর এই পথটি ধরেই মিজো নেতা লাল ডেঙা চলাচল করতেন।"

কেমন দেখতে ছিলেন উনি? — শিশুসুলভ এমন কৌতুহলের জবাবে তিনি বলে চলেন:

"লাল ডেঙা ছিলেন খুব লম্বা – চওড়া বলশালী মানুষ। বয়স প্রায় ৫০ বছর। পরনে সাদা শাট আর নীল প্যান্ট। সব সময় ওনার নিরাপত্তায় থাকতো ৫০ – ৬০ জনের একটি গেরিলা বাহিনী। ওদের পরনে ছিলো পাতা – সবুজ পোষাক। নানা রকম ভাড়ি অস্ত্র – শস্ত্র সবার হাতে হাতে। মিজো দলে অনেক মহিলা যোদ্ধাও ছিলো। কিন্তু মিজো বাহিনী খুব খারাপ।…"

কেনো?

তার উত্তর:
১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত মিজো বাহিনী আমাদের এখানে ছিলো। তারা দিনের পর দিন আমাদের গ্রামে আস্তানা গেড়ে বাস করতো। আমরা তাদের খাওয়াতাম, আবার চাঁদার টাকাও দিতাম। তাদের ছাগল, মুরগী, শুকর কেটে ভাত দিতে হতো। আমাদের কোনো মেয়েকে তাদের পছন্দ হলে জোর করে ওরা বিয়ে করতো। আমাদের দিয়ে ওরা এক ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্পে বিনে পয়সায় বোঝা টানাতো।"

একবার আমাদের গ্রামের একজন বম মেয়েকে মিজো বাহিনী বিয়ে করে ওপারে মিজোরামে নিয়ে যেতে চায়। আমি বাধা দিলে ওরা আমাদের তিনজনকে গুলি করে মারার জন্য এক সারিতে দাঁড় করিয়েছিলো। পাহাড় – জঙ্গল ভেঙে আমরা দৌড়ে পালিয়ে সেবার বাঁচি।"

...আমি শুনেছি, মিজোরাম দেশটি নাকি খুব সুন্দর। মিজো বাহিনী জয়লাভের পর ওখানে নাকি এখন খুব শান্তি। জিনিষপত্রের দাম খুব শস্তা, জুম করা যায়, ঘন বনে শিকারও মেলে প্রচুর। কিন্তু আমি কখনো মিজেরামে যাবো না। মিজো বাহিনী খুব খারাপ।…"

সাংবাদিকরা জানতে চান, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর সঙ্গে মিজো বাহিনীর কখনো বন্দুক যুদ্ধ হয়নি?

সাংলিয়ান দা বলেন:
"আরে না! পাকিস্তান আর্মি আর বাংলাদেশ আর্মিই তো মিজো বাহিনীকে এপাড়ে আশ্রয় দিয়েছে। ওরা মিলেমিশে থাকতো। কেউ কাউকে ঘাঁটাতো না। মাঝে মাঝে এ – ওর ক্যাম্পে বসে চা – বিস্কুটও খেতো!…"

পরে ইতিহাস ঘেঁটে জানা যাবে, পাক সেনারা ১৯৭১ সালে মুক্তিবাহিনী দমনে লাল ডেঙ্গার মিজো বাহিনীকে ব্যবহার করেছিল! সে আরেক ইতিহাস।

এই সব আলাপ-চারিতা শেষে পাহাড়ের পর খাড়া পাহাড় ডিঙিয়ে ক্রেওক্রাডং-এর চূড়ায় উঠে যাওয়ারকালে কথা হবে কিশোর মুদি দোকানী সাহিত বম-এর সঙ্গে দার্জিলিং পাড়া নামক গ্রামে। সামান্য অর্থের বিনিময়ে সব্জি-ভাতের ব্যবস্থা হবে দুপুরের আহার হিসেবে।

আরো পরে একদল হাসিখুশী বম শিশু-কিশোর অভিযাত্রীদের অভ্যর্থনা জানাবে ক্রেওক্রাডং-এর চূড়ায়। বড়দিনের প্রস্তুতি হিসেবে গিটার বাজিয়ে গান চর্চার ফাঁকে তারা ঝটপট আগুন জ্বেলে চূলা বানিয়ে তৈরি করবে লাল চা। খুব মিষ্টি সেই চা তারা পরিবেশন করবে কাঁচা বাঁশের চোঙ দিয়ে বানানো কাপে। ...

ক্রেওক্রাডং-এর সিঁড়িতে শিশু-কিশোরের দল স্মার্টলি বসে পোজও দেবে ছবির জন্য। পর্বত শিখরে বুদ্ধ-সাংলিয়ান দা'র যখন পৃথক ছবি তোলা হবে, তখন পাতলা কুয়াশার মতো হঠাৎ মেঘ এসে ভিজিয়ে দিয়ে যাবে পোষাক-আশাক, চশমার কাঁচ, খানিকটা চেতনা ও সর্বস্ব। দূরের তাজিনডং পর্বত শিখর দেখে মনে পড়বে রবী বুড়োর গান:
"আকাশে হেলান দিয়ে
পাহাড় ঘুমায় ওই..."

For details press http://unmochon.net/node/1152

Sunday, January 01, 2012

চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় হেডম্যানরা দায়িত্ব পালন করতে পারছে না : সন্তু লারমা | চট্টগ্রামের রাজনীতি

বুধবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০১১পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা(সন্তু লারমা) বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে প্রথাগত নেতৃত্ব হেডম্যানরা (মৌজা প্রধান) তাদের দায়িত্ব কর্তব্য যথাযথ পালন করে যেতে পারছেন না এবং হেডম্যানদের দায়িত্ব কর্তব্য পালন ও অর্থনেতিক যে সমস্যা রয়েছে তা সমাধান করা যাচ্ছে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে হেডম্যানরা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনেতিকভাবে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ১৯৯৭ সালে ২ ডিসেম্বর সম্পাদিত পার্বত্য চুক্তিতে হেডম্যানদের নেতৃত্বের গতিশীল ও জীবনমান উনন্নয়নের জন্য সম্পৃক্ত করা হয়েছে। কিন্তু পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় হেডম্যানদের ভূমি ব্যবস্থাপনাসহ যাবতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে পারছেন না। তাই একমাত্র পার্বত্য চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে হেডম্যানদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদনের পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব। তিনি পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে ঐতিহ্যবাহী প্রথাগত নেতৃত্ব হেডম্যানসহ সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে এসে আন্দোলন সংগ্রামে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান। বুধবার রাঙামাটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত প্রথম পার্বত্য চট্টগ্রামের হেডম্যান সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সন্তু লারমা এইসব মন্তব্য করেন। ABCNEWS24.com - চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় হেডম্যানরা দায়িত্ব পালন করতে পারছে না : সন্তু লারমা চট্টগ্রামের রাজনীতি

IRIN Asia | BANGLADESH: Indigenous groups face land-grabbing in north | Bangladesh | Human Rights | Refugees/IDPs

Northern Bangladesh’s mostly Hindu indigenous people are still coming under land-grabbing pressure from the country’s predominantly Bengali Muslim population, say activists. “There is a process through which the indigenous population is being deprived of their land rights,” Mizanur Rahman, chairman of Bangladesh’s government-appointed National Human Rights Commission (NHRC), told IRIN. “There is a problem of land-grabbing of Santals [a northern indigenous group] and other people in the name of development, social forestation - to plant trees on their land for the overall benefit of society. It is later sold as `khas’ land [public land],” he said. Mesbah Kamal, secretary-general of the National Coalition for Indigenous People (NCIP), says 75 groups distinct from ethnic Bengalis are still found in Bangladesh. Collectively, they are referred to as Adivasis. But ethnic Bengalis make up 99 percent of the country’s over 140 million people, making minorities vulnerable to land-grabbing by Bengalis, say activists. A 2009 book entitled Life and Land of Adibashis (Adivasis) by the Human Development Research Centre (HDRC) , a Bangladeshi NGO, found that dispossession of land among northern indigenous tribes was “extensive”. The book says 65 percent of the indigenous Santal community based in the north has experienced dispossession of land - in total, 818sqkm of land valued at nearly US$900 million has been forcibly grabbed from northern indigenous tribes. Such loss of land has had grave repercussions for the indigenous population, most of whom are rural and derive their income from the land, activists say. Absolute poverty According to HDRC, 60 percent of Adivasis living in the northern plains fall below the UN’s definition of absolute poverty, compared to 39.5 percent of people in rural Bangladesh. Land-grabbing peaked between 1971 and 1980 in the immediate aftermath of the independence war fought by Bangladesh against Pakistan, experts say. “Our land was grabbed with little pretence, with brute force,” remembers Ganesh Shoren, a Santal activist. “As many Santals had fled to India during the war, many Bengalis thought `hey we can get this land for free,’ and occupied it. The returning families [after the war] then had to start their lives from scratch, without land, without a source of food.” The Bangladesh Indigenous People’s Forum, commonly known as the Bangladesh Adivasi Forum, alleges that land-grabbing is continuing in the northern plains.

The government has also been accused by activists of using the Enemy Property Act, renamed the Vested Property Act in 1974, to seize Adivasi land. The Act allowed the government to take over private property by declaring an individual an enemy of the state, and the US Department of State, among others, have held it responsible for causing internal displacement not just of indigenous people but of almost 10 million ethnic Bengali Hindus as well. And while the act was repealed in 2001, activists say property seized has yet to be returned and that the law essentially remains in force. “As long as the Vested Property Act is not amended, Bangladesh will remain a non-secular state,” said NCIP’s Kamal. Undercounting of minorities? The government has also been accused of undercounting minority populations in order to further marginalize them. “Indigenous groups claim there are three million Adivasis in Bangladesh, but the government officially acknowledges an indigenous population of only 1.4 million,” Kamal told IRIN. The 15th amendment of the Bangladeshi constitution in 2011 classified the Santals and other groups as “ethnic minorities” rather than “indigenous people”. According to indigenous activists, this allows the government to circumvent its obligations related to the land rights of indigenous groups, including the rights of ownership to land they traditionally occupied, and the right to the natural resources there. “In India there are laws to protect indigenous land: They are specially regulated lands,” said Santal activist Shoren. Earlier this year, Foreign Minister Dipu Moni controversially remarked that Bengalis are the true indigenous people of the area, and that tribal people came to Bangladesh as asylum-seekers and economic migrants. “Giving a special and elevated identity to enfranchise only 1.2 percent of the total population of 150 million by disentitling the 98.8 percent cannot be in the national interest of Bangladesh," she said in a 26 July meeting with senior diplomats and media editors on the constitutional amendment. But government-appointed NHRC Chairman Rahman disagrees: “Our position was very clear from the very beginning: there is an indigenous population and they need special protection and recognition… We are also advocating that Bangladesh signs and ratifies International Labour Organization Convention 169, which deals with the land rights of indigenous populations.”

Wednesday, December 21, 2011

পার্বত্য চট্টগ্রাম ‘জাতীয় নিরাপত্তার’ স্বার্থে নতুন নতুন শর্তারোপ? জোবাইদা নাসরীন

বারবার ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র ধোয়া তুলে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর নতুন নতুন শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলে বসবাসকারী আদিবাসীদের নিয়ে নামকরণ রাজনীতির পর সরকার সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশিদের পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণের ওপর কঠিন শর্ত আরোপ করেছে। দুই বছর ধরে বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসীদের পরিচিতি নিয়ে ব্যাপক তর্কবিতর্ক শুরু হয়। নির্বাচনী ইশতেহার থেকে সরে এসে এবং আদিবাসীদের সব দাবি অগ্রাহ্য করে সংবিধান সংশোধনীতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে আদিবাসীদের প্রথমবারের মতো সংবিধানে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
একই বছর ‘উপজাতি’ ও ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ দুটো পরিচিতি সরকারিভাবে তৈরি করা হয় এবং একে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সরকারি তৎপরতা জোরদার করা হয়। ডিসেম্বরে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় এবং ইউএনডিপির যৌথ উদ্যোগে করা ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ মেলা আদিবাসীদের বিভিন্ন ফোরাম থেকে বযকট করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির সম্পর্কটি অনেকটাই স্পষ্ট হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সময়ে নেওয়া অবস্থান পর্যালোচনা করলে। সাম্প্রতিক চাপিয়ে দেওয়া নিয়মটি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিরই অংশ। এই নতুন নিয়ম অনুযায়ী পাসপোর্ট, ভিসা, স্বরাষ্ট্র-পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতির পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থান করতে হলে বিদেশিদের সেখানকার জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিতে হবে। শুধু তা-ই নয়, তারা সেখানকার আদিবাসী বাসিন্দাদের সঙ্গে স্বাধীনভাবে কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনা করতে পারবে না।
বিদেশিদের শুধু অনুমতি নিলেই চলবে না, এর সঙ্গে রয়েছে শর্ত। বিদেশি নাগরিকদের পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা করতে হলে একজন সরকারি দায়িত্বশীল কর্মকর্তার উপস্থিতি লাগবে। বলা হয়েছে যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ‘জাতীয় নিরাপত্তার’ স্বার্থে এসব শর্ত আরোপ করা হয়েছে। তবে এই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ বিষয়টি কার জন্য, কার ‘নিরাপত্তার’ স্বার্থ এতে রক্ষিত হয়, তা সহজেই অনুমেয়। ‘জাতীয়’ স্বার্থটিতে কোনোভাবেই পাহাড়ে বসবাসকারী আদিবাসীদের কোনো স্থান নেই। তবে বলা যায়, সরকারের এই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র পরিসর শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের দিয়ে। আর এই ‘নিরাপত্তা’র প্যাকেজ দিয়ে নির্মিত সম্পর্কের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির সঙ্গে আদিবাসীদের সম্পর্ক।
বিদেশি নাগরিকদের অনুমতিপত্রে আরও বেশ কিছু বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, বান্দরবান জেলার যেকোনো স্থানে ভ্রমণের ক্ষেত্রে ভ্রমণকালীন কর্মকাণ্ড ও স্থান সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট থানায় সুস্পষ্ট অবহিত করে পুলিশের সহায়তায় ভ্রমণ স্থানে যাতায়াত করতে হবে। ভ্রমণ সম্পর্কে পুলিশকে অবহিত করা নির্ধারিত উদ্দেশ্য ব্যতীত কোনো রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। এবং আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু পূর্বনির্ধারিত ভ্রমণের স্থানগুলো বাদে অন্য কোনো স্থানে ধর্মীয় আলোচনা এবং প্রচারসংক্রান্ত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বা বক্তব্য প্রদান করা যাবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামকেন্দ্রিক সরকারের এই নতুন শর্তের অংশ হিসেবে গত মাসের শেষ দিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনের সদস্যদেরও বান্দরবানের উজানিপাড়ায় অনুষ্ঠান করতে দেওয়া হয়নি। কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, তারা প্রশাসনকে অবহিত করেনি।
তাহলে সরকার কি স্বীকার করে নিচ্ছে যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ? বাংলাদেশের অন্য আট-দশটি জেলায় কোনো বিদেশি গেলে সেখানে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। যদি বিদেশিদের বাংলাদেশের আগমনের একটি উদ্দেশ্যই থাকে, তাহলে অন্য জেলাগুলোতেও তা হওয়ার কথা। সেখানে তাহলে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না কেন? দেশে একমাত্র এই তিনটি জেলাতেই বিজিবি এবং সেনাবাহিনীর বিভিন্ন চেকপোস্টে গাড়ি দাঁড় করানো হয়। অনেক চেকপোস্টে নাম লিখতে হয়। বাকি ৬১টি জেলায় এটি হয় না। কেন হয় না? এই তিনটি জেলাতেই শুধু ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ বিঘ্নিত হওয়ার উপাদান আছে?
কারণ, সবাই জানে যে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে সরকারের উদ্দেশ্য ভিন্ন। এর আগে যখন দেশের ৬১টি জেলায় মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক ছিল, তখনো দীর্ঘদিন শুধু ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র জন্য খাগড়াছড়ি, বান্দরবান এবং রাঙামাটি জেলা মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্কের বাইরে ছিল। তবে মজার বিষয় হলো, তখন কিন্তু সেনা ক্যাম্পগুলোতে মোবাইল ফোন চালু ছিল। সেখান থেকে পাহাড়ের আদিবাসীরা অন্য জায়গায় কথা বলতে পারত, কিন্তু শর্ত ছিল একটাই। তাদের বাংলা ভাষায় ফোনালাপ করতে হবে, যেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা বুঝতে পারে তারা কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র করছে কি না। এই যদি হয় রাষ্ট্রের সঙ্গে বসবাসকারী আদিবাসীদের সম্পর্ক, তাহলে বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসীদের দিন দিন নতুন নতুন শর্তের চাদরে ঢেকে যাওয়ারই কথা। শুধু তা-ই নয়, বাঙালি সরকারি কর্মকর্তাদের শাস্তিকেন্দ্রিক বদলি হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিবেচনা করার মনসিকতা এখনো বাংলাদেশে জারি আছে, যা আসলে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষদের রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের অংশ হিসেবে স্বীকৃতির প্রসঙ্গে দোনোমনাভাব তৈরি করায়।
আর ধর্ম প্রচারের যে অভিযোগ সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে তোলা হচ্ছে, সেটি যে আসলে কোনো গুরুত্ব বহন করে না, তা আমরা বান্দরবান জেলার আদিবাসীদের ধর্মীয় পরিসংখ্যানের চিত্র থেকেই বুঝতে পারি। সেখানে মুসলিম আছে ৪৭.৬২ শতাংশ, বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ৩৮ শতাংশ, খ্রিষ্টান ৭.২৭ শতাংশ, হিন্দু ৩.৫২ শতাংশ এবং ৩.৫৯ শতাংশ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। এই পরিসংখ্যান নিশ্চয়ই আমাদের এই বিষয়ে নিশ্চিত করে যে পার্বত্য চট্টগ্রামে সব বিদেশিই ধর্ম প্রচারে আসেন এবং তাঁরা ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে অর্থ দিচ্ছেন—সরকারের এই আনুমানিক বয়ান নিশ্চিতভাবেই সঠিক নয়।
তাহলে অনুমাননির্ভর ধারণার ওপর ভিত্তি করে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন নতুন শর্ত তৈরি করছে, তা রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক বন্ধুত্ববাদকে খারিজ করে সাংস্কৃতিক একাত্মবাদী মানসিকতা তৈরি করতে সহায়তা করছে। আশা করি অচিরেই এ ধরনের শর্ত থেকে সরকার সরে এসে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকেন্দ্রিক ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিত্যাগ করে মুক্তির আলোকেই এই আদিবাসী মানুষদের সঙ্গে সম্পর্কের খোঁজ করবে।
জোবাইদা নাসরীন: সহকারী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পিএইচডি গবেষক, ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য।
zobaidanasreen@gmail.com

 

আদিবাসী, ভূমি ও জীবন

আদিবাসীদের কাছে ভূমিই জীবন, ভূমিই অস্তিত্ব। আদিবাসীদের ভূমি অধিকার কিছু বলার আগে, সম্পদ, ভূমি, বন, প্রাণী জগত, ধরিত্রী ও অধিকার সম্পর্কে আদ...